শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২৬ - ১৬:৫৪
বিশ্ব আজ ‘আইন’-এর সঙ্গে দ্বন্দ্বে রয়েছে

জাকার্তায় নিযুক্ত ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক ‘ইসলাম, আইন ও সমাজ’ সম্মেলনে বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে আইনের ঘাটতির চেয়ে বরং ‘আইন প্রণয়নের দর্শনে সংকট’ বেশি প্রকট।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা ইয়াহিয়া জাহাঙ্গিরি আন্তর্জাতিক ‘ইসলাম, আইন ও সমাজ’ সম্মেলনে অংশ নিয়ে সমকালীন আইন প্রণয়নব্যবস্থার দার্শনিক চ্যালেঞ্জগুলো পর্যালোচনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে আইনের অভাবের চেয়ে ‘আইন প্রণয়নের দর্শনে সংকট’ বেশি দেখা যাচ্ছে। বিদ্যমান আইনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সব মানুষের পাশাপাশি জীবজন্তু এবং অতীত ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারকে ন্যায়সঙ্গতভাবে বিবেচনা করতে সক্ষম নয়।

“আইন কার জন্য প্রণীত হয়?”-এই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আধুনিক আইনি ব্যবস্থার একটি বড় অংশ মানবতাবাদী ও মানুষকেন্দ্রিক ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে। ফলে মানুষ আইন প্রণয়নের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর ফলে প্রকৃতি ও অন্যান্য জীবের অধিকার সাধারণত তখনই বিবেচনায় আসে, যখন সেগুলোর সঙ্গে মানুষের স্বার্থের কোনো সম্পর্ক থাকে।

জাহাঙ্গিরি এই দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে বলেন, প্রকৃতি, প্রাণী ও অন্যান্য জীবন্ত সত্তাকে শুধু মানুষের জন্য তাদের উপযোগিতা ও লাভের কারণে মূল্যবান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সৃষ্টিজগতের সামগ্রিক ব্যবস্থায় তাদেরও নিজস্ব মর্যাদা ও অধিকার রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ায় ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা এ প্রসঙ্গে সূরা আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াতের উল্লেখ করেন। সেখানে কোরআন প্রাণীদের “তোমাদের মতোই জাতি” হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তিনি বলেন, এই কোরআনিক বক্তব্য দেখায় যে মানুষ এই পৃথিবীর একমাত্র অধিবাসী বা মালিক নয়; বরং অন্যান্য সৃষ্টির পাশে নিজেকে দেখতে হবে, তাদের পরম মালিক হিসেবে নয়।

এরপর তিনি মানবাধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, সমকালীন আইনি ব্যবস্থায় যখন ‘মানবাধিকার’-এর কথা বলা হয়, তখন প্রশ্ন করা উচিত-কোন মানুষের অধিকার বোঝানো হচ্ছে?

ইন্দোনেশিয়ায় ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান বিশ্বে বহু ক্ষেত্রে মানুষের অধিকার তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য কিংবা আন্তর্জাতিক মর্যাদার ভিত্তিতে সমানভাবে বিবেচিত হয় না। আদিবাসী জনগোষ্ঠী, দখলদারিত্বের অধীনে থাকা জাতি, নিপীড়িত মানুষ, অভিবাসী, উদ্বাস্তু এবং যেসব গোষ্ঠীর পর্যাপ্ত গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই-তাদের অধিকার কখনো কখনো উপেক্ষিত হয়।

জাহাঙ্গিরি জোর দিয়ে বলেন, একটি আইন তখনই নৈতিক বৈধতা অর্জন করতে পারে, যখন তা জাতি, নৃগোষ্ঠী, নাগরিকত্ব, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব নির্বিশেষে সব মানুষের মর্যাদা স্বীকার করে। যে আইন কেবল ক্ষমতাবানদের কণ্ঠ শোনে কিন্তু ক্ষমতাহীনদের কণ্ঠ উপেক্ষা করে, সেটি আনুষ্ঠানিক অর্থে আইন হতে পারে; কিন্তু তা অপরিহার্যভাবে ন্যায়সঙ্গত নয়।

তিনি ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার’-কে আইন প্রণয়নের নতুন দর্শনে বিবেচনা করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, বন, ভূগর্ভস্থ পানি, জ্বালানি, অর্থনীতি এমনকি সরকারি ঋণ নিয়ে আজ যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে, তা সরাসরি এমন মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে, যারা এখনো জন্মগ্রহণ করেনি।

‘আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আজ থেকে একশ বছর পর জন্মগ্রহণ করবে এমন একজন মানুষের প্রতিনিধিত্ব কে করছে?’-এই প্রশ্ন তুলে জাহাঙ্গিরি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আজ ভোট নেই, গণমাধ্যম নেই এবং প্রতিবাদ করার ক্ষমতাও নেই। কিন্তু নিঃসন্দেহে তাদের অধিকার রয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম কেবল বর্তমান সময়ের মালিকানার দাবি করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ ভোগ বা আত্মসাৎ করতে পারে না।

জাহাঙ্গিরি জোর দিয়ে বলেন, ‘আন্তঃপ্রজন্মীয় ন্যায়বিচার’কে বৈশ্বিক আইন প্রণয়নের অন্যতম মৌলিক নীতিতে পরিণত করা উচিত। পৃথিবী ও প্রাকৃতিক সম্পদকে শুধু বর্তমান প্রজন্মের সম্পত্তি হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বর্তমান প্রজন্মের কাছে অর্পিত একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

তিনি একইসঙ্গে ‘অতীত প্রজন্মের অধিকার ও উত্তরাধিকার’-এর প্রতিও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্ম পূর্ববর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত বিপুল ঐতিহ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। সেই ঐতিহ্যের স্রষ্টারা আজ আমাদের মাঝে নেই-শুধু এই কারণে বর্তমান প্রজন্ম তা উপেক্ষা করতে পারে না।

ইন্দোনেশিয়ায় ইরানের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টার মতে, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ শুধু অতীতের প্রতি ভালোবাসার বিষয় নয়; বরং এটি এক ধরনের ‘ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার’ এবং তাদের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব, যারা নিজেদের সভ্যতাগত সম্পদ বর্তমান প্রজন্মের হাতে অর্পণ করে গেছেন।

এরপর জাহাঙ্গিরি ‘আইন প্রণয়নকারীর স্বার্থের সংঘাত’ কে আইন প্রণয়নের দর্শনের আরেকটি মৌলিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মানুষ যখন নিজেই আইন প্রণয়ন করে এবং একইসঙ্গে সেই আইনের প্রধান সুবিধাভোগীও হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-কী নিশ্চয়তা রয়েছে যে আইনগুলো মানুষের নিজের স্বার্থে অথবা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থে দখল বা ব্যবহার করা হবে না?

তিনি আরও বলেন, মানুষ প্রাণীদের অধিকার নিয়ে আইন প্রণয়ন করে, অথচ নিজেরাই সেই প্রাণীদের ভোক্তা। বর্তমান প্রজন্ম প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, অথচ সেই সম্পদের প্রধান ভোক্তাও তারাই। একইভাবে বৃহৎ শক্তিগুলোও বহু আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, অথচ তারাই আবার এসব কাঠামোর ফলাফল থেকে উপকৃত হয়।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha